আমার দেখায় সংক্রমণ ও সহাবস্থান
আমার দেখায় সংক্রমণ ও সহাবস্থান
প্রেক্ষাপট:
ধরে নিন এটা কোনো- নার্সিংহোমে এ বসে লেখা কিছু আবেগ বা অনুভূতির কথা। পজিটিভ সিম্পটম থেকে ধরে নিই পজিটিভিটির বা সচেতনতার গল্প। এ গল্পের সূচনা হয়তো অনেক আগেই দরকার ছিল। এ গল্পের অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ির পথমুখী। ভাইরাস কিংবা প্রকৃতির মারণ খেলার মাঝে- কাঠপুতুল মানুষ আজ কতটা অসহায় এই কদিনে উপলব্ধির দৃশ্যমান কান্ডারী আমি।কতগুলো টুকরো গল্প,কতগুলো অসহায় মুখ,প্রতিটি মুহূর্তে মানসিক টেনশন,কত একাকীত্ব,কতগুলো বেঁচে থাকার লড়াই,স্বাস্থ্যকর্মীদের অমানুষিক পরিশ্রম-না দেখলে জীবনের একটা অংশ যেন বাকি থেকে যেত।কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি,কিছু বন্ধন দৃঢ় হবে আসা করি-
গল্প ১: বাবা ও ছেলে(বয়স 65)
ভ্যাকসিন নেয়ার দুতিন দিনের মধ্যে অনেকের জ্বর আসছে।অনেকের ভালো হয়ে যাচ্ছে,অনেকের হচ্ছে না।বিশেষত যাদের এলার্জি প্রবলেম আছে তাদের একটু হয়তো প্রবলেম হচ্ছে।যদিও বলে রাখি মেডিক্যাল ডিগ্রি আমার নেই।এমন কেসে বাবারও দুতিন দিন জ্বর,পরে ভালো হলেও শরীর দুর্বল,প্রেসার কম ও অক্সিজেন লেভেল 90 এর ঘরে আপ ডাউন।এসময় হয়তো অনেক বাড়িতে অক্সিমিটার আছে,যাদের নেই,সচেতন হতে হবে।জ্বর যাই হোক না কেন -অক্সিজেন লেভেল কিন্তু জ্বরের পর 4/5 দিন চেক করে যেতে হবে।বিশেষত এই প্যান্ডামিক পরিস্থিতে।মজার ব্যাপার হলো নিজের শরীর জানান দেয় মেডিক্যাল সাপোর্ট লাগতে পারে কিনা।শরীর দুর্বল,বাড়িতে মা একা,আমি বাইরে থাকি। বাবা আর নিজেই বাড়িতে থাকতে চাইলেন না।অগত্যা নার্সিং হোমে পাঠানোর ব্যবস্থা কয়েক ঘন্টার মধ্যে।কাছে নেই আমি,ভোটের জন্য লাস্ট 2 মাস ধরে ব্যস্ত।কাউন্টিং ডিউটি আছে।কিন্তু তার আগের রাতে এই সিচুয়েশন অনভিপ্রেত ছিল।এই পরিস্থিতিতে মাথা আর কাজ করছে না।বাবাকে নিয়ে কে আসবে সেইটা ম্যানেজ করাটা এই পরিস্থিতিতে কতটা কঠিন -যারা ভুক্তভোগী হবে,তারাই জানবে।যাদের আমরা এক্সপেক্ট করি তারাই কেউ পাশে থাকছে না-এখন।বিশ্বাস,এক্সপেক্টশন,পাশে থাকা সব কিছু যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়-কে আপন কে পর।
এযেন এক নতুন মানব সভ্যতায় আমাদের পদার্পন।সব গল্পে পাশে আসছে অপরিচিত মানুষ। ভেবে দেখলে রোগী আমরা আজ সবাই,বিশেষ করে মনোরোগী।নিজেরা ভুলে যাই একই পরিস্থিতি হয়তো কাল আমাদের ঘরে হতে পারে।কবেই ভুলে গেছি- সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।শারীরিক ভাবে পাশে না থেকেও মানসিক ভাবে পাশে থাকতে হবে।যাই হোক এই সিচুয়েশন এ দেবদুতের মতো আমাদের জামাইবাবু নার্সিং হোম বুকিং ও এম্বুলেন্সে করে ভর্তি করলো।অথচ স্বাভাবিক পরিস্থিতি হলে বাড়ির পাশের কতজন কে দেখেছি রোগী নিয়ে যাওয়ায় হিড়িক।কিন্তু এখন সে সব জিনিস গুড়ে বালি,একেবারে এক ঘরে হয়ে যাওয়া কেস অনেক জায়গায়।এই সময় যে পরিবার গুলো মেন্টালি ও কাউকে পাচ্ছে না-ভাবলে গা শিউরে উঠছে।খবরের চ্যানেলে প্রায় এই খবর ফুটে ওঠে। তবে আমাদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব সবাই ফোনে অনবরত কন্টাক্ট এ থাকছেন।বুঝতে পারছি রোগ বা রোগী পাশের পরিচিত মানুষের সাথে কথা বললে বা পাশে থাকার কথা বুঝলে কতটা নিজেকে মানসিক ভাবে শক্তিশালী মনে করে।তাই এমন পরিস্থিতি কারো হলে দূরে নয় মানসিক বাঁধন আরো শক্ত করতে হবে।এখনো আমরা সত্যি যে সচেতন হয়নি এই 3/4 দিনের প্রতিটি কেস থেকে বলছি।সবার 90% একই অসুস্থতার লক্ষণ।
সচেতনতা,অতি বা অর্ধসচেতনতা,অসচেতনতার পার্থক্য যেখানে আজ অতি শিক্ষিত মানুষ করতে ব্যর্থ,সেখানে মনে হয় হাজার ভালো তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষ।আজ পুরো সমাজের দিকে তাকালে দুটো ক্যাটাগরিতে মানুষ পাবেন (5% সচেতন মানুষ ছাড়া)। এই 5% এর মধ্যে 60% ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার পাবেন।এই মুহূর্তে মাঝের ক্যাটাগরিতে (অতি বা অর্ধসচেতন) যে লোকজন থাকে, তারাই পুরো ভুল বোঝানোর দায় নিয়ে বসে বসে অসহায় মানুষকে আরো অসহায় করে দিচ্ছে।যে মানুষটা 10 দিন আগে ভোটের দামামা বাজিয়ে ভোটে মানুষ জড়ো করলো,সেই ভিড়ে মাস্ক কখনো চিবুক,কখনো গলায়,কখনো বুক পকেটে রেখে অসচেতনতার চূড়ান্ত সীমা লঙ্ঘন করে ফেললো-সেই আজ সচেতনতার ভড়ং করে রোগী থেকে দূরে থাকতে সব দরজা বন্ধ করে দিলো।লড়াই তো আমাদের রোগের সাথে,রোগীর সাথে নয়।এই কমন কথা কমন ম্যান না বুঝলে,কে আর বুঝবে!
এমনিতে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বেড এর আকাল,পরিজনদের চিকিৎসার খরচ ও পরিশেষে চারপাশে অসহযোগিতার প্রসার যদি বেড়ে চলে এমনভাবে,তাহলে রোগের কাছে রোগী কিন্তু হেরে যাবে।আমরা সবাই তাই এই অঙ্গীকার করি- সেফ ডিস্টেন্স মেনে সেবা করবো,যতটা যার সামর্থ্য ।বুঝতে হবে রোগী শুধু identify হলে রোগ ছড়ায় না,তার আগেই অজান্তে রোগ ছড়ায়।যারা সেই রোগীর সেবা করছে তারা কিন্তু সেফ ডিস্টেন্স এবং নিয়ম মেনে আমার আপনার বাড়ির লোকের সেবা করছে,হোক না যত সেটা -অর্থের বিনিময়ে।
তমলুকে নার্সিংহোমে এ এডমিশন করা হলো। জামাইবাবু ও বোন যে কাজ সাহস নিয়ে করলো, তা নিয়ে কোনো কিছু কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা নেই।বাড়ি থেকে দূরে রোগীর সাথে থাকাটা একটা বড় ইস্যু।এই সিচুয়েশন এ হোটেল এ থাকাটা শোভনীয় নয়।প্রথম দিন ভর্তির রাত ওরাই থাকলো বাবার সাথে।সামনের দিনগুলোতে যদি এমন কারো সাথে হয়- কে থাকবে রোগীর সাথে,এটাই কিন্তু আমাদের সবার জীবনের বড়ো চ্যালেঞ্জ।ঠিক করে রাখুন সকলে,হয়তো দেখবেন আপনি যাকে বিশ্বাস করেছেন-তাকে নাও পেতে পারেন।ভর্তির রাত আমি আর আমার স্ত্রী সারারাত একঘন্টা হয়তোও ঘুমোই নি বা বলতে পারি ঘুমোতে পারি নি।সত্যি বলতে কি রাগ অভিমানের তুলনায় ওই দিন উৎকণ্ঠা পুরোপুরি জেঁকে বসেছিল স্ত্রীর মাথায়।একমুঠো ভাত কারো গলায় নামে নি। বোন আর বউ এর কাকুতি মিনতি আমাকেও উৎকণ্ঠাতে ফেলে দিলো।কিছুদিন আগে আমাদের সতীর্থর বাবা হঠাৎ------।না পরের জন্য নয় এই কয়দিন নিজের জন্য লড়াই করতে হবে।সাহস বাড়ানো বা পাশে থাকা-আমাকে যেতেই হবে।রাত তখন 11-30 ডিসিশন ফাইনাল- পরের দিন কাউন্টিং টেবিলে নয় আমাকে যেতে হবে ফ্যামিলির পাশে।আমাদের ARO স্যার কে ব্যাপারটা মেসেজ করে জানালাম।উনি সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের পাশে যেতে বললেন।ওই রাতের মধ্যে গাড়ি যোগাড়ে আমাদের এক মাস্টারমশাই এতটা হেল্প করলেন যে নিজেই ভোর 5টায় গাড়ি নিয়ে হাজির।আমাদের অনেক বন্ধু পরিদর্শকদের পার্সোনাল মেসেজ পেয়েছি,গ্রুপে মেসেজ পেয়েছি।সত্যি বলতে ওই মুহুর্তে রিপ্লাই দেওয়ার মতো সময় পরিস্থিতি কোনোটাই আমার কাছে নেই।সদ্য পিতৃহারা সতীর্থও আমাকে ফোনে কথা বলেছে নিজের ওই পরিস্থিতিতে। এই সব ছোট্ট ছোট্ট মেসেজ অনেক সাহস দেয়।তমলুক পৌঁছলাম সকাল 8-30 এর দিকে।অনেক দিন পর ছেলেকে দেখলে বাবার বুক যে বেড়ে ওঠে এটা আমাদের এক সতীর্থ বরাবর আড্ডা হলে বলে।ঠিক তাই বিশ্বাস করি আমি।সত্যি বলছি মেডিসিন তার কাজ হয়তো করে কিন্তু অনুঘটক এর কাজ কিন্তু এই সম্পর্ক গুলোর অনুদান।অনেকটা আশা ভরসা এর ঝলকানি দেখলাম তার চোখে।সঙ্গে থাকার দায়িত্ব নিয়ে নিলাম।এই কয়দিন নিজে হাতে যতটা পারা যায় প্রোটেকশন নিয়ে সেবার কাজে লেগে গেলাম।বললে হয়তো অনেকে বিশ্বাস করবে না আমার নিজের ও এক অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল।আমরা হয়তো যারা বাইরে চাকরি বাকরি করি ফ্যামিলির প্রতি দায়বদ্ধতা মেটাই কিছুটা টাকা পয়সা,কিছুটা অল্পস্বল্প সময় অতিবাহিত করে।
নিজের হাতে খাবার দেয়া,মাথা ধোয়ানো,জামা কাপড় চেঞ্জ,সারারাত অনতিদূরে বসে থেকে pulse বা অক্সিজেন লেভেল এ ঢুলুঢুলু চাওয়া,রিপোর্ট আনা,ওষুধ খাওয়ানো,ডাক্তারবাবুর সাথে ভিজিট এর সময় কথা বলা, বন্ধু ডক্টরের (স্কুল ফ্রেন্ড) সাথে যথারীতি মেসেজ করে সময় অসময়ে সাজেশান,শেষে মা আর বউ এর সাথে সবার স্ট্যাটাস ঝালিয়ে নেয়া,মাসি- মামাবাড়ি সবার সঙ্গে কথার গ্রন্থিবন্ধন ইত্যাদি করতে করতে দেখলাম সত্যি এর মধ্যে যে এত আনন্দ থাকে তা করার সৌভাগ্য হয়তো এই প্রথম পেলাম।
বাবা নিজের মতো করে লড়াই করছে রোগের বিরুদ্ধে।শরীরের immunity লড়াই করবে।তাকে যেমন support করে high cost medicine ,হয়তো বা support করে আমাদের পাশে থাকার ইচ্ছেটাও।এই পরিস্থিতিতে দূরের কেউ না থাক, কাছে রেঞ্জে যারা থাকবে যতটা পারো পাশে থেকো।আপনার শরীরে vaccination নেয়া থাক বা না থাক শুধু একটা ফোন করে ভালো মন্দ নেওয়া,6ft দূরত্ব থেকে মাস্ক পরে খাবার দিয়ে যাওয়া,বাজার করে দেয়া,যদি পারা যায় নিজের সাধ্যমত টাকাপয়সা হেল্প বা খোঁজ খবর দেয়াটাও কিন্তু বাঁচাতে পারে অনেক জীবন।
দূরে থাকলেও বাড়ির সব আপন লোকেরা খোঁজ নিয়েছে ফোনে নিয়মিত।এমন একটা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা ধরে নিয়ে হবে আমাদের চারপাশে যতগুলো মানুষ দেখা যাচ্ছে- তাদের মধ্যে 50% লোকজন এফেক্টেড বা পজিটিভ। ম্যাক্সিমাম মানুষের মধ্যে মেজর কোনো সিম্পটম নেই,তাহলে যাদের সিম্পটম দেখতে অফিসিয়াল পাচ্ছি ,তাদের কেন অলিখিত দূরে সরিয়ে দেবেন।তবুও তো এখন আমাদের কাছে বিজ্ঞানের দেয়া অনেক হাতিয়ার রয়েছে এর বিরুদ্ধে লড়াই করার।দূরে থেকেও পাশে থাকার আর্ট আমাদের সবাই কে শিখতে হবে।যারা কোভিড যোদ্ধা তাদের কেও সাহস যোগাতে হবে।মনে রাখবেন এরাই প্রকৃত সৈনিক এই প্যান্ডামিক সময়ে।সবার মধ্যে থাকা positivity র আলোর ছটা ভাগ করে দিতে হবে সবার মাঝে।সেই আলোতে বলীয়ান হবে রোগের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া অনেক মুমূর্ষু মানুষ।
3দিনের ফার্স্ট phase এর লড়াই আমি জানি শুধু বাবা একা হয়তো অফিসিয়াল ভাবে রয়েছে এবং 3 দিন পর জেনারেল বেড এ শিফট হয়েছেন।কিন্তু তার পেছনে অনেকগুলো মানুষ বিভিন্ন ভাবে তাদের অবদান রেখেছে।আবার অনেককে পেলো না যাদের হয়তো অবদান রাখার মতো জায়গা ছিল।অমানুষিক পরিশ্রম দেখলাম নার্সিং স্টাফদের।এখন কার সিস্টেম কে যদি দাবা বোর্ডের সাথে তুলনায় যাই,ওরা তবে বোড়ে।সারাক্ষন যারা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অচেনা মানুষের সেবায় লেগে যায়।এদের মধ্যে অনেকে কিন্তু high paid এমপ্লয়ী নয়,এটা মনে রাখতে হবে।আস্তে আস্তে অনেকটা রিকভারি হচ্ছে বাবা।মনের জোরটাও পাচ্ছে,এখন ফোনে সকলের সাথে কথা বলে।আমারও কয়েকদিন ঘুম বা বিশ্রাম নেই ভালো,তাও যারা সঙ্গে থাকে তাদের দুর্বল হলে চলে না।সুস্থ থাকতে হবে সকলকে।
গল্প 2: স্বামী ও স্ত্রী:(বয়স 45)
এটা পাশের কেবিন এর গল্প ছিল,কিন্তু লাস্ট 2দিন পাশের বেডে এনারা আছেন।এই কয় দিন শুধুমাত্র বসে থাকি নি।সময় পেলে ডিস্টেন্স মেনে কিছু লড়াই এর ঘটনাও দেখলাম।যতটা পেরেছি মেন্টাল বুস্টআপ করেছি ওনাদের।কখনো চা,খাবার আনতে গিয়ে অন্যদেরও নিয়ে এসেছি।সবার গল্পে কাছের অনেকে থাকতে চায় নি বা পারে নি।এনাদের গল্প শুরু করা যাক।খুব পরিশ্রমী একান্নবর্তী পরিবার খাটুনির জীবন।একই গল্প জ্বর শরীর দুর্বল 4/5 দিন পর অক্সিজেন লেবেল শর্ট।বাড়িতে অন্যদের দুএকজন এর সিম্পটম হলেও সবাই ঠিক কিন্তু এনাকে ভর্তি হতে হলো।মহিলাটি এই কয়দিন দেখলাম সারাক্ষণ স্বামীর পাশে আছে।পাশেই ঘুমোচ্ছে মাস্ক পরে।আমি বললাম আপনার কোনো সিম্পটম দেখাচ্ছে না।উনি বললেন তেমন কিছু নয়।ওনাদের বাড়ির দুএকজনের এমন কন্ডিশন ছিল কিন্তু টুকটাক ঔষুধ খেয়ে ঠিক আছেন তারা।যাদের immunity ভালো আছে তাদের প্রবলেম হচ্ছে না তেমন, এটা মোটামুটি সবাই আমরা জানি কিন্তু এই সময় নিজের প্রোটেকশন নিয়েও কিন্তু সেবা করছে অনেকে সুস্থ থেকে।ভগবানের কাছে চাই তারা ভালো থাক,যাতে সাহস করে আবার হয়তো কারো বিপদে তারা পাশে থাকতে পারবে। এনাদের দুজনের কারো কোনো vaccination হয়নি।বেশি দেরিতে আসেননি তাই রিকভারি তাড়াতাড়ি করছেন।
গল্প 3: ছেলে ও মা:(বয়স 25)
এই কয়দিনে আমার দেখা খারাপ কন্ডিশন।পাশের কেবিন এ ভর্তি,বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে।দরজার ফাঁক দিয়ে মনিটর এ মাঝে মাঝে চোখ পড়তো।একসময় অক্সিজেন লেভেল 40 তেও নেমে যেতে দেখেছি।শরীরের কাঁপুনি ,হাঁপানি দেখতে পেয়েছি পর্দার ফাঁক দিয়ে।এত কম বয়সে এতটা এফেক্টেড।প্রায় 90% ফুসফুস এফেক্টেড।আসতে বা বুঝতে দেরি করেছে পরিবার।কলকাতায় বাবার সাথে কাজ করতে গিয়েছিল ছেলেটা।বাবা মা সবাই ঠিক আছে কিন্তু ভুক্তভোগী হলো ছেলেটি।কিছুতেই অক্সিজেন লেভেল stay হচ্ছে না এখনো পর্যন্ত।মাঝে মাঝে ফোর্স দিয়ে অক্সিজেন বাইপাস করতে হচ্ছে।কিছু কিছু high dose ইনজেকশন ডিরেক্ট পুশ করছে,মাঝে মাঝে ছেলেটা চিৎকার করে উঠছে।ছেলের কষ্টে মা কখনো দৌড়ে নার্সিং স্টাফ এর কাছে ছুটে যাচ্ছে।কিন্তু ছেলেকে ছেড়ে 5 মিনিটের বেশি কোথাও যাচ্ছে না।কখনো এদের খাবার বাড়ি থেকে না নিয়ে এলে, আমি নিজে কয়েকদিন বয়ে নিয়ে এসেছি।কোনো মা এই পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়বে স্বাভাবিক।টুকরো কথার মাঝেও ওনাকে শক্ত হতে বললাম।মানসিক জোর এদের ভীষণ দরকার।বিশেষ করে রোগীকে হাসিখুশি রাখা।না হলে মানসিক অবসাদে চলে যাচ্ছে অনেকে।বয়স অল্প ছেলেটা লড়াই এখনো চালিয়ে যাচ্ছে।হঠাৎ করে বাড়ির লোক ওর শরীরের তেমন প্রোগ্রেস হচ্ছে না দেখে ডাক্তার বাবুর সাথে আলোচনা করে অন্য হাসপাতালে মুভ করছে। এখনো ওর অনেকটা পথ চলা বাকি।জানিনা কতটা লড়াই ছেলেটা লড়তে পারবে!
গল্প 4: বাবা,মা ও ছেলেঃ(বয়স 59)
তিনজনের ছোট সংসার, বাবা সুগারের পেশেন্ট।আনতে একটু দেরি হতে ফুসফুস সংক্রমণ প্রায় 80%।শারীরিক ভাবে দুর্বল থাকা ও high sugar এর জন্য অক্সিজেন saturation fall করছে।এনারা আমাদের আসার প্রায় 2/3দিন আগেই ভর্তি হয়েছেন।তাও এখনো recovery করতে সময় লাগবে মনে হয়।অক্সিজেন support ছাড়া এখনো 94/95 লেভেল stay করছে না।মা ছেলে বাবার সাথেই মাস্ক পরে সেবা করছে।এখনো চলছে এনাদের লড়াই।কয়েকদিন মনে আরো এনাদের থাকতে হবে।
গল্প 5: স্বামী ও স্ত্রী:(বয়স 38)
এখানে স্বামীর ফুসফুসের সংক্রমণ।শুয়ে আছে ভীষণ কাশি,হাঁফানি ধরেছে প্রবল। অক্সিজেন saturation fall করছে।প্রোনিং চলছে একাই বছর 25 এর স্ত্রী লড়াইতে পাশে।মাঝে মাঝে মহিলার ভাই এসে খাবার দিয়ে যাচ্ছে।এনার সমস্যার আরো একটা বড় ইস্যু এনাদের ভিজিটিং ডক্টর অনেক গ্যাপ এ গ্যাপ এ ভিজিট এ আসছেন।দরকারে অন্য ডক্টর কেউ এই situation এ দেখতে চাইছে না নিজের patient ছাড়া।আমাদের আসার আগে এনারা ভর্তি হয়েছিলেন। situation খারাপ,ভিজিটিং ডক্টর ছুটিতে বা কম থাকার জন্য আজ আবার রোগীকে শিফট করে অন্য কোভিড হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।জানিনা কতটা লড়াই ছেলেটা লড়তে পারবে!
গল্প 6: স্বামী ও স্ত্রী:(বয়স 52)
আমরা নার্সিংহোমে আসার দুদিন পর রাত্রে এনাদের আগমন।বাবা মা দুই মেয়ে।বাবার কাশি জ্বর অক্সিজেন প্রবলেম।মা কিংবা মেয়েদের মেজর সিম্পটম নেই।মেয়েদের বাড়ি পাঠিয়ে দিলো।45 উর্ধ মহিলা স্বামীর লড়াই এ শামিল হলো।ভর্তি করে দিয়ে সারাক্ষন নিকট আত্মীয়দের ফোন করছে অনবরত।সেখানে যেমন বাড়ির মেয়েদের ব্যাপারে খোঁজখবর আছে,তেমন দেখলাম খরচের জোগাড় নিয়েও চিন্তিত তিনি।আপাতত স্থিতিশীল আছে saturation লেভেল।
গল্প 7: সন্তান, মা,বাবা(বয়স 2 বছর)
এটা ছোট্ট শিশুর ছোট্ট একটা চ্যাপ্টার।রাত তখন 11.30 হবে মনে হয়।পুলিশ গাড়িতে চড়ে একটা ছোট শিশুর পরিবার এলো কাঁদতে কাঁদতে।শিশুটি ঝিমিয়ে আছে।গায়ে জ্বর সারাদিনে তিনচারবার সাথে বমি।বাবার গা খালি শুধু একটা শর্ট বারমুন্ডা প্যান্ট পরে চলে এসেছে।মায়ের অবস্থা কেঁদে কেটে একসারা।খুব আর্জেন্ট বেসিস এ ডক্টর দেখলেন এবং ডিস্ট্রিক্ট হসপিটাল এ রেফার করলেন ভালো পরিষেবার জন্য।জানি না ছেলেটি এখন কেমন আছে! জানিনা মারণ ভাইরাস তাকেও attack করেছে কিনা।
গল্প শেষ হোক:
এমন অনেক টুকরো টুকরো গল্প কত ঘটে চলছে আমাদের আশেপাশে।কত আরো আসবে, যাবে সময়ের সাথে সাথে।কিন্তু এখনো আমাদের সকলের মধ্যে আসেনি সচেতনতার বিন্দুমাত্র আলো। positive এর লক্ষন দেখা দিলে সেই পরিবারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়া বন্ধ করতে হবে।পাশে দাঁড়ানোর অভ্যেস সকলকে তাড়াতাড়ি রপ্ত করতে হবে।না হলে কাল আপনার নিজের পরিবারের সাথে এমন কিন্তু হয়ে যেতে পারে।অনেক চাওয়া পাওয়া প্রতিশ্রুতি গ্রামে শহরে দেশে নেতারা দিয়ে যায় ভোটের আগে।এই মুহূর্তে সবার আগে তাদেরকেও দল মত নির্বিশেষে এগিয়ে আস্তে হবে।পারলে টেম্পোরারি হেলথ facility ও অক্সিজেন রাখতে হবে গ্রামের লোকাল স্বাস্থ্যকেন্দ্রে।কর্মীর অভাব হলে তরুণ যুবকদের এগিয়ে আস্তে হবে।পারলে গ্রামে শহরে এমন ভোলেন্টারি নিয়োগ করলে ভালো হয়।আমরা সচেতন সবাই এম্বুলেন্সের ধ্বনি,খবরের নেগেটিভিটি,কোনো ফুলের(বড় বা ছোট) লড়াই এই মুহূর্তে দেখতে চাই না,আমরা ফিরে পেতে চাই সেই আগের পৃথিবী।আমরা চাইনা মুখ আর ঢেকে রাখতে,আমরা চাই সকলে জীবনের গান আর সকলের সহাবস্থান।
চারিদিকের মৃত্যুমিছিলের যাত্রা রথ বন্ধ করো-হে ভগবান।ভ্যাক্টিনেশন খুব দ্রুত করা দরকার।সকলকে প্রচুর গাছ লাগানো দরকার।দরকার হয়তো নতুন করে চিপকো আন্দোলনের। পজিটিভিটির আলোয় যত দিন না লড়াইটা জিতে যাই, ততদিন একসাথে থাক
'সংক্রমণ ও সহাবস্থান' ।
Comments
Post a Comment